সরাসরি বিষয়বস্তুতে যান

সরাসরি বিষয়সূচিতে যান

জীবনকাহিনি

খ্রিস্টের একজন সৈনিক হওয়ার জন্য দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ

খ্রিস্টের একজন সৈনিক হওয়ার জন্য দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ

বন্ধুকের গুলিগুলো যখন শোঁ শোঁ শব্দ করে আমার পাশ দিয়ে যেতে থাকে, তখন আমি ধীরে ধীরে একটা সাদা রুমাল তুলে ধরি। যে-সৈন্যরা গুলি করছিল, তারা চিৎকার করে আমাকে আড়াল থেকে বেরিয়ে আসতে বলে। আমি অত্যন্ত সাবধানে তাদের দিকে এগিয়ে যাই, যদিও জানতাম না তারা আমাকে মেরে ফেলবে, না বাঁচিয়ে রাখবে। কীভাবে আমি এইরকম এক বিপদজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলাম?

উনিশ-শো ছাব্বিশ সালে কারিৎজা নামে গ্রিসের একটা ছোট্ট গ্রামে আমার জন্ম হয়। আমার বাবা-মা ছিলেন খুবই পরিশ্রমী আর তাদের আট সন্তানের মধ্যে আমি ছিলাম সপ্তম।

আমার জন্মের এক বছর আগে, আমার বাবা-মায়ের সঙ্গে জন পাপারিজস্‌ নামে একজন উদ্যোগী বাইবেল ছাত্রের (যিহোবার সাক্ষিদের সেই সময় এই নামে ডাকা হতো) দেখা হয়, যিনি কথা বলতে খুব ভালোবাসতেন। ভাই জনের কাছ থেকে তারা যখন বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য শাস্ত্রীয় যুক্তি জানতে পারেন, তখন সেগুলো তাদের উপর গভীর ছাপ ফেলে আর তাই তারা আমাদের গ্রামে বাইবেল ছাত্রদের যে-সভা হতো, সেখানে যোগ দিতে শুরু করেন। যিহোবা ঈশ্বরের উপর আমার মায়ের দৃঢ়বিশ্বাস ছিল আর যদিও তিনি পড়াশোনা জানতেন না, তবুও প্রতিটা উপযুক্ত সুযোগে তিনি অন্যদের যিহোবা ঈশ্বর সম্বন্ধে জানাতেন। দুঃখের বিষয় হল, আমার বাবা মানুষের অসিদ্ধতার উপর বেশি মনোযোগ দিয়েছিলেন বলে ধীরে ধীরে সভাগুলোতে যাওয়া বন্ধ করে দেন।

যদিও বাইবেলের প্রতি আমাদের সব ভাই-বোনেরই সম্মান ছিল কিন্তু তরুণ-তরুণী হিসেবে আমরা আমাদের চারপাশের আমোদপ্রমোদের দ্বারা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ি। এরপর, ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যখন ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে, তখন আমাদের গ্রামের একটা ঘটনা আমাদের হতবাক করে দেয়। আমার এক আত্মীয় নিকোলাস সারাসকে বাধ্যতামূলকভাবে গ্রিক সেনাবাহিনীতে নিযুক্ত করা হয়, যিনি আমাদের বাড়ির কাছেই থাকতেন এবং সবেমাত্র বাপ্তিস্ম নিয়েছিলেন। ২০ বছর বয়সি নিকোলাস সাহসের সঙ্গে সামরিক কর্তৃপক্ষকে বলেন, “যেহেতু আমি খ্রিস্টের একজন সৈনিক, তাই আমি যুদ্ধ করতে পারি না।” সামরিক আদালতে তার বিচার হয় এবং তাকে দশ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এতে আমরা একেবারে আশ্চর্য হয়ে যাই!

কিন্তু আনন্দের বিষয় হল, ১৯৪১ সালে যখন মিত্রবাহিনী কিছুসময়ের জন্য গ্রিসে প্রবেশ করে, তখন নিকোলাস জেল থেকে ছাড়া পান। তিনি কারিৎজায় ফিরে আসেন আর আমার দাদা ইলিয়াস তাকে বাইবেল সম্বন্ধে হাজারো প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে শুরু করেন। আমি মন দিয়ে তাদের কথা শুনি। এরপর, আমার দাদা ইলিয়াস, আমি ও আমাদের সবচেয়ে ছোটো বোন এফমর্‌ফিয়া বাইবেল অধ্যয়ন করতে শুরু করি এবং নিয়মিতভাবে সাক্ষিদের সভাগুলোতে যোগ দিতে থাকি। পরের বছরই আমরা তিন জন যিহোবার কাছে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করি এবং বাপ্তিস্ম নিই। পরবর্তী সময়ে, আমার আরও চার ভাই-বোন বিশ্বস্ত সাক্ষি হয়ে ওঠে।

১৯৪২ সালে কারিৎজা মণ্ডলীতে যে-ভাই-বোনেরা ছিল, তাদের মধ্যে নয় জনের বয়স ছিল তুলনামূলকভাবে কম অর্থাৎ ১৫-২৫ বছরের মধ্যে। আমরা সবাই জানতাম যে, শীঘ্রই আমাদের চরম পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে। তাই, নিজেদের শক্তিশালী করার জন্য আমরা যখনই সম্ভব একত্রে মিলিত হয়ে বাইবেল অধ্যয়ন করতাম, ঈশ্বরের উদ্দেশে গান গাইতাম এবং প্রার্থনা করতাম। আর এভাবে আমাদের বিশ্বাস শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

কারিৎজায় দিমিত্রিয়াস এবং তার বন্ধুরা

গৃহযুদ্ধ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ প্রায় শেষ হতে যাচ্ছিল এমন সময় গ্রিক কমিউনিস্টরা (সাম্যবাদী) গ্রিক সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে আর এর ফলে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। কমিউনিস্ট গেরিলা সৈন্যরা গ্রামের এলাকাগুলোতে ঢুকে গ্রামবাসীদের জোর করে তাদের দলে নিয়ে আসার চেষ্টা করে। তারা যখন আমাদের গ্রামে হামলা করে, তখন তারা তিন জন তরুণ সাক্ষিকে—অ্যান্তনীয় সুকারিস, ইলিয়াস এবং আমাকে—অপহরণ করে নিয়ে যায়। তাদের আমরা বার বার খ্রিস্টান হিসেবে আমাদের নিরপেক্ষতা সম্বন্ধে বলতে থাকি; তা সত্ত্বেও তারা আমাদের জোর করে আমাদের গ্রাম থেকে প্রায় ১২ ঘণ্টা হাঁটিয়ে অলিম্পাস পর্বতে নিয়ে যায়।

সেখানে যাওয়ার পর পরই একজন কমিউনিস্ট অফিসার আমাদের গেরিলাবাহিনীর দলে যোগ দেওয়ার আদেশ দেন। আমরা যখন ব্যাখ্যা করি যে, সত্য খ্রিস্টানরা সহমানবদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে নেয় না, তখন তিনি অত্যন্ত রেগে যান এবং আমাদের টানতে টানতে তাদের জেনারেল অফিসারের কাছে নিয়ে যান। আমরা যখন পুনরায় আমাদের অবস্থান সম্বন্ধে ব্যাখ্যা করি, তখন সেই জেনারেল আমাদের এই আদেশ দেন, “তা হলে তোমরা একটা খচ্চরের পিঠে করে আহত সৈন্যদের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কাজ করো।”

আমরা বলি, “কিন্তু, আমরা যদি সরকারি সৈন্যদের হাতে ধরা পড়ি? তারা কি আমাদের সক্রিয় সৈন্য বলে মনে করবে না?” তখন তিনি বলেন, “তা হলে যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্যদের জন্য রুটি নিয়ে যাওয়ার কাজ করো।” উত্তরে আমরা এই যুক্তি তুলে ধরি, “কিন্তু, আমাদের সঙ্গে খচ্চর দেখে কোনো গেরিলা অফিসার যদি আমাদের যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্র বয়ে নিয়ে যেতে বলে?” সেই জেনারেল অনেক সময় নিয়ে চিন্তা করার পর অবশেষে চিৎকার করে বলেন: “মেষ চরাতে নিশ্চয়ই তোমাদের কোনো সমস্যা নেই! তা হলে পাহাড়ের উপর মেষ চরানোর কাজ করো।”

আমাদের চারিদিকে গৃহযুদ্ধ চরম হয়ে উঠেছিল আর আমাদের তিন জনের মনে হয়েছিল, আমাদের বিবেক মেষ চরানোর কাজ করার অনুমতি দেবে। এক বছর পর, বড়ো ছেলে হিসেবে ইলিয়াসকে বাড়ি ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়, যেন তিনি আমাদের বিধবা মায়ের যত্ন নিতে পারেন। অ্যান্তনীয় অসুস্থ হয়ে পড়েন আর তাকেও ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু, আমাকে বন্দি হিসেবেই রেখে দেওয়া হয়।

ইতিমধ্যে, গ্রিক সৈন্যরা কমিউনিস্টদের ধীরে ধীরে ঘিরে ফেলতে শুরু করে। আমাকে যে-দলের মধ্যে বন্দি করে রাখা হয়েছিল, তারা পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশ আলবানিয়ায় পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। সীমান্তের ঠিক কাছাকাছি আসার পর হঠাৎ আমরা বুঝতে পারি, গ্রিক সৈন্যরা আমাদের ঘিরে ফেলেছে। বিদ্রোহীরা ভয় পেয়ে পালিয়ে যায়। আর আমি মাটিতে পড়ে থাকা একটা গাছের পিছনে লুকিয়ে যাই। এভাবেই আমি শুরুতে বলা সৈন্যদের মুখোমুখি হই।

আমি যখন গ্রিক সৈন্যদের বলি যে, কমিউনিস্টরা আমাকে বন্দি করে রেখেছিল, তখন তারা আমার বিচার করার জন্য আমাকে ভিরয়ার কাছাকাছি একটা সেনাশিবিরে নিয়ে যায়। এই ভিরয়া হল বাইবেলে উল্লেখিত প্রাচীন বিরয়া নগর। সেখানে আমাকে সৈন্যদের জন্য ট্রেঞ্চ (লম্বা করে কাটা গর্ত, যেখানে লুকিয়ে থেকে সৈন্যরা যুদ্ধ করে) খোঁড়ার আদেশ দেওয়া হয়। আমি যখন এই কাজ করতে প্রত্যাখ্যান করি, তখন কমান্ডিং অফিসার ভয়ংকর শাস্তি হিসেবে আমাকে মাক্রানিসস (মাক্রানিসি) দ্বীপে নির্বাসনে পাঠানোর আদেশ দেন।

আতঙ্কের দ্বীপ

এথেন্স থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার (৩০ মাইল) দূরে আটিকা সমুদ্রের উপকূলে অবস্থিত এক রুক্ষ, নির্জল ও উত্তপ্ত দ্বীপের নাম ছিল মাক্রানিসস। দ্বীপটা দৈর্ঘ্যে মাত্র ১৩ কিলোমিটার (আট মাইল) এবং প্রস্থে সর্বোচ্চ ২.৫ কিলোমিটার (১.৫ মাইল)। তা সত্ত্বেও, ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত সেখানে ১,০০,০০০-রও বেশি বন্দিকে আটক করে রাখা হয়েছিল, যাদের মধ্যে ছিল সক্রিয় ও সন্দেহভাজন কমিউনিস্ট, প্রাক্তন প্রতিরোধী যোদ্ধা এবং অসংখ্য বিশ্বস্ত যিহোবার সাক্ষি।

১৯৪৯ সালের শুরুর দিকে সেখানে পৌঁছানোর পর আমি দেখি, ইতিমধ্যেই বন্দিদের ভাগ ভাগ করে বিভিন্ন শিবিরে রাখা হয়েছে। আমাকে কয়েক-শো বন্দির সঙ্গে এমন একটা শিবিরে রাখা হয়, যেখানে তুলনামূলকভাবে কম নজর রাখা হতো। একটা তাঁবুর মধ্যে আমরা প্রায় ৪০ জন বন্দি মাটিতে ঘুমাতাম, যেটা আসলে ১০ জনের জন্য ছিল। আমাদের নোংরা জল এবং বেশিরভাগ সময়ই ডাল ও বেগুন খেতে হতো। সবসময় ধুলোবালি ও বাতাসের কারণে আমাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। তবে, একটা সান্ত্বনা ছিল যে, অন্ততপক্ষে আমাদের দীর্ঘসময় ধরে ভারী ভারী পাথর বইতে হতো না। এটা ছিল এমন এক নিষ্ঠুর অত্যাচার, যেটার ফলে বহু দুর্দশাগ্রস্ত বন্দি শারীরিকভাবে অক্ষম হয়ে পড়েছিল এবং মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিল।

মাক্রানিসস দ্বীপে অন্যান্য নির্বাসিত সাক্ষিদের সঙ্গে

একদিন সমুদ্রসৈকত দিয়ে হাঁটার সময় অন্যান্য শিবিরের বেশ কয়েক জন সাক্ষির সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়। একত্রে মিলিত হতে পেরে আমরা কত আনন্দিতই-না হয়েছিলাম! নজর এড়ানোর জন্য যথাসম্ভব সাবধানতা অবলম্বন করে আমরা যখনই সুযোগ পেতাম, একত্রে মিলিত হতাম। এ ছাড়া, আমরা বিচক্ষণতার সঙ্গে অন্য বন্দিদের কাছেও প্রচার করতাম, যাদের মধ্যে কেউ কেউ পরবর্তী সময়ে যিহোবার সাক্ষি হয়েছিল। এই বিষয়গুলো ও সেইসঙ্গে আন্তরিক প্রার্থনা আমাদের যিহোবার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখতে সাহায্য করেছিল।

এক জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে

দশ মাস ‘পুনর্বাসনের’ পর আমার বন্দিকর্তারা মনে করে যে, এবার আমি সৈন্যদের পোশাক পরতে রাজি হব। আমি যখন তা পরতে প্রত্যাখ্যান করি, তখন তারা আমাকে টানতে টানতে সেই শিবিরের আর্মি অফিসারের কাছে নিয়ে যায়। আমি তার হাতে এই লিখিত বিবৃতি দিই, “আমি কেবল খ্রিস্টেরই সৈনিক হতে চাই।” আমাকে ভয় দেখানোর পর সেই অফিসার তার অধীনস্থ আরেক ব্যক্তির কাছে পাঠান। তিনি হলেন একজন গ্রিক অর্থোডক্স আর্চবিশপ, যিনি পুরোপুরিভাবে ধর্মীয় পোশাকে সজ্জিত ছিলেন। আমি যখন সাহসের সঙ্গে শাস্ত্র থেকে তার প্রশ্নগুলোর উত্তর দিই, তখন তিনি প্রচণ্ড রেগে গিয়ে চিৎকার করে বলেন: “একে এখান থেকে নিয়ে যাও। এই ব্যক্তি কখনোই শোধরাবে না!”

পরের দিন সকালে সৈন্যরা আবার আমাকে সৈন্যদের পোশাক পরার আদেশ দেয়। আবারও আমি প্রত্যাখ্যান করি আর তারা আমাকে ঘুসি মারতে থাকে এবং লাঠি দিয়ে পেটাতে শুরু করে। এরপর, আমার শরীরের কোনো হাড় ভেঙে গিয়েছে কি না, তা দেখার জন্য তারা আমাকে শিবিরের চিকিৎসালয়ে নিয়ে যায় এবং পরে টানতে টানতে আবার তাঁবুতে এনে ফেলে রাখে। এই অত্যাচার দু-মাস ধরে চলতে থাকে।

যেহেতু আমি কোনোভাবেই আমার বিশ্বাসের ব্যাপারে আপোশ করছিলাম না, তাই সৈন্যরা বিরক্ত হয়ে অবশেষে আমাকে এক নতুন পদ্ধতিতে শাস্তি দেওয়া শুরু করে। সৈন্যরা আমার দু-হাত পিছনের দিকে বেঁধে পায়ের তলায় শক্ত দড়ি দিয়ে নির্মমভাবে মারতে থাকে। সেই অসহ্য যন্ত্রণার সময় আমি যিশুর এই কথাগুলো স্মরণ করি: “ধন্য তোমরা, যখন লোকে . . . তোমাদিগকে নিন্দা ও তাড়না করে, . . . আনন্দ করিও, উল্লাসিত হইও, কেননা স্বর্গে তোমাদের পুরস্কার প্রচুর; কারণ তোমাদের পূর্ব্বে যে ভাববাদিগণ ছিলেন, তাঁহাদিগকে তাহারা সেই মত তাড়না করিত।” (মথি ৫:১১, ১২) এভাবে অনেক সময় ধরে চলতে থাকে, পরে একসময় আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ি।

জ্ঞান ফিরে আসার পর আমি বুঝতে পারি, আমাকে এমন একটা ঠাণ্ডা কারাকক্ষে রাখা হয়েছে, যেখানে কোনো রুটি, জল অথবা কোনো কম্বল নেই। তা সত্ত্বেও, আমি শান্তি অনুভব করি। বাইবেলের প্রতিজ্ঞা অনুযায়ী, ‘ঈশ্বরের শান্তি আমার হৃদয় ও মনকে রক্ষা’ করে। (ফিলি. ৪:৭) পরের দিন একজন সদয় সৈন্য আমাকে রুটি ও জল খেতে দেন এবং পরার জন্য একটা ওভারকোটও দেন। এরপর, আরেকজন সৈন্য আমাকে তার নিজের ভাগের খাবার খেতে দেন। এভাবে ও সেইসঙ্গে অন্যান্য আরও অনেক উপায়ে আমি যিহোবার কোমল যত্ন অনুভব করি।

শিবিরের কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিতে আমি একগুঁয়ে বিদ্রোহী হয়ে উঠি আর তাই তারা বিচারের জন্য আমাকে এথেন্সের সামরিক আদালতে নিয়ে যায়। সেখানে আমাকে মাক্রানিসস দ্বীপ থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার (৩০ মাইল) পূর্বে অবস্থিত ইয়ারস্‌ (গিয়ারস্‌) নামে একটা দ্বীপে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

“তোমাদের উপর বিশ্বাস করা যায়”

ইয়ারস্‌ কারাগারটা ছিল লাল ইটের তৈরি এক বিশাল দূর্গ, যেখানে ৫,০০০-রেরও বেশি রাজনৈতিক বন্দিকে রাখা হয়েছিল। এ ছাড়া, সেখানে সাত জন যিহোবার সাক্ষিও ছিল, যারা সবাই খ্রিস্টান হিসেবে নিরপেক্ষতা বজায় রাখার কারণে শাস্তি ভোগ করছিল। যদিও একেবারে নিষিদ্ধ ছিল, তবুও আমরা সাত জন গোপনে মিলিত হয়ে বাইবেল অধ্যয়ন করতাম। আমরা এমনকী নিয়মিতভাবে গোপনে প্রহরীদুর্গ পত্রিকাও পেতাম, যেগুলো হাতে কপি করে আমরা অধ্যয়নের জন্য ব্যবহার করতাম।

একদিন গোপনে অধ্যয়ন করার সময় একজন কারারক্ষী হঠাৎ আমাদের দেখে ফেলেন এবং আমাদের সাহিত্যাদি কেড়ে নেন। আমাদের ধরে ভারপ্রাপ্ত কারাধ্যক্ষের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। আমরা নিশ্চিত ছিলাম, আমাদের শাস্তির সময় বাড়িয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু, আমাদের অবাক করে দিয়ে সেই ভারপ্রাপ্ত কারাধ্যক্ষ বলেন: “আমরা তোমাদের সম্বন্ধে ভালোভাবে জানি আর আমরা তোমাদের অবস্থানকে সম্মান করি। আমরা এও জানি, তোমাদের উপর বিশ্বাস করা যায়। কাজে ফিরে যাও।” তিনি এমনকী আমাদের মধ্যে কাউকে কাউকে তুলনামূলকভাবে সহজ কাজ দেন। আমাদের হৃদয় যিহোবার প্রতি কৃতজ্ঞতায় ভরে ওঠে। এমনকী জেলের মধ্যেও খ্রিস্টান হিসেবে আমাদের বিশ্বস্ততা যিহোবার প্রশংসা নিয়ে আসে।

এ ছাড়া, আমাদের দৃঢ়তা অন্যান্য উত্তম ফল নিয়ে আসে। আমাদের উত্তম আচার-ব্যবহার ভালোভাবে লক্ষ করার পর একজন বন্দি, যিনি অঙ্কের অধ্যাপক ছিলেন, অনুপ্রাণিত হয়ে আমাদের বিশ্বাস সম্বন্ধে জানতে চান। ১৯৫১ সালের শুরুর দিকে সাক্ষিরা যখন ছাড়া পায়, তখন তিনিও ছাড়া পান। পরবর্তী সময়ে তিনি একজন বাপ্তাইজিত সাক্ষি হন এবং পূর্ণসময়ের প্রচার কাজ শুরু করেন।

এখনও একজন সৈনিক

আমার স্ত্রী জ্যানেটের সঙ্গে

ছাড়া পাওয়ার পর আমি কারিৎজায় আমার পরিবারের কাছে ফিরে যাই। পরে, আমার স্বজাতীয় অনেক লোকের সঙ্গে আমিও অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে যাই এবং সেখানে স্থায়ীভাবে বাস করতে শুরু করি। সেখানে একজন উত্তম খ্রিস্টান বোন জ্যানেটের সঙ্গে আমার দেখা হয়। আমরা বিয়ে করি এবং আমাদের এক ছেলে ও তিন মেয়ের জন্ম হয় আর আমরা চার জনকেই সত্যে মানুষ করে তুলি।

বর্তমানে আমার বয়স ৯০ বছরেরও বেশি আর আমি এখনও একজন খ্রিস্টান প্রাচীন হিসেবে সেবা করছি। পুরোনো আঘাতের কারণে কখনো কখনো আমার শরীরে ও পায়ে প্রচণ্ড ব্যথা হয়, বিশেষ করে প্রচার কাজে অংশ নেওয়ার পর। তা সত্ত্বেও, আমি এখনও “খ্রীষ্ট যীশুর” একজন “যোদ্ধা” বা সৈনিক হওয়ার জন্য দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ।—২ তীম. ২:৩.